ময়মনসিংহ সিটিতে খালের ওপর ১২ তলা ভবন : নকশা ফাইল তলব, তদন্তে প্রশাসন
গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন (মসিক) এলাকার চরপাড়ায় খালের ওপর ১২ তলা বিশিষ্ট ইউনিয়ন স্পেশালাইজড হাসপাতাল লিমিটেড-এর ভবন নির্মাণকে ঘিরে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
একই সঙ্গে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের তথ্যও সামনে এসেছে। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট ভবনের নকশা ও অনুমোদনসংক্রান্ত ফাইল তলব করেছে প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মসিকের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া এলাকায় খালের নির্ধারিত সীমানা সংরক্ষণ না করেই ভবনটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী খালের উভয় পাশে নির্দিষ্ট পরিমাণ জায়গা খালি রাখার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানা হয়নি বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করতে পারে। এতে আশপাশের বসতবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। পরিবেশবিদরাও বলছেন, খাল দখল বা সংকুচিত হয়ে গেলে নগরীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এদিকে নগরীর কাচিঝুলি, আকুয়া ও কলেজ রোড এলাকায় নির্মিত কয়েকটি ৮ থেকে ১০ তলা ভবন নিয়েও উঠেছে একাধিক অভিযোগ। সংশ্লিষ্টরা জানান, এসব ভবনের অনেকগুলোতেই নির্ধারিত সেটব্যাক মানা হয়নি। কোথাও পর্যাপ্ত পার্কিং সুবিধা রাখা হয়নি, আবার কোথাও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থায় রয়েছে ঘাটতি।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ভবন আবাসিক নকশায় অনুমোদন নিয়ে পরবর্তীতে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন নগর পরিকল্পনা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে যানজট ও নিরাপত্তা ঝুঁকি।
বর্তমানে বিভাগীয় কমিশনার, যিনি সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি নগর পরিকল্পনাবিদের মাধ্যমে ইউনিয়ন স্পেশালাইজড হাসপাতাল ভবনের নকশাসংক্রান্ত ফাইল তলব করেছেন।
অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মুহাম্মদ আশরাফুল সিদ্দিকী পাঠানের বরাবর গত ২৫ ফেব্রুয়ারি নগর পরিকল্পনাবিদ মানষ বিশ্বাস স্বাক্ষরিত একটি লিখিত চিঠি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে অনুমোদিত নকশা, অনুমোদনপত্র ও মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাইয়ের জন্য পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে সিটি কর্পোরেশনে হাজির হতে বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, অনুমোদিত নকশা অনুযায়ীই ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, কোনো কারিগরি ত্রুটি বা ব্যত্যয় থাকলে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধান করা হবে।
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি সব কিছু নিয়ম মেনেই হয়ে থাকে, তাহলে খালের সীমানা ও নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত আপত্তি কেন উঠছে? তারা দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে এলাকাবাসী খাল ও সড়ক দখলমুক্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় যদি নিয়ম ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণের সংস্কৃতি চলতে থাকে, তবে নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ সুরক্ষা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হবে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, একটি শহর টেকসই রাখতে হলে খাল, ড্রেন ও জলাধার সংরক্ষণে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় উন্নয়নের নামে অব্যবস্থাপনা ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সামনে কী?
নকশা ও কাগজপত্র যাচাই শেষে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন নগরবাসী। তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ভবনের অংশবিশেষ অপসারণ, জরিমানা কিংবা অন্যান্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ময়মনসিংহ নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সুরক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ কতটা দৃশ্যমান হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।








