গোলাম কিবরিয়া পলাশ, ময়মনসিংহ প্রতিনিধি:
ময়মনসিংহ নগরীতে খুন ও ছিনতাইয়ের উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতিতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। শিক্ষার্থী, শ্রমজীবী, অটোরিকশাচালক থেকে শুরু করে পথচারী—কেউই ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলায় মোট ১১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার অন্তত ২০টি সংঘটিত হয়েছে ছিনতাইকে কেন্দ্র করে। একই বছরে ছিনতাইয়ের ঘটনায় ৬০টি মামলা দায়ের এবং ৪৬৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি নগরীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদ-এর চরে ঘুরতে গিয়ে ছিনতাইকারীদের ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে নিখোঁজ হন আনন্দ মোহন কলেজ-এর শিক্ষার্থী নুরুল্লাহ শাওন। দুই দিন পর নদী থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা বিক্ষোভ মিছিল ও পুলিশ সুপারের কার্যালয় ঘেরাও করে দ্রুত খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
পুলিশের তথ্যমতে, বছরে ৪৬৭ জন গ্রেপ্তার হলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, বাস্তবে প্রতি মাসে প্রায় এক হাজারের বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। নগরীর কোতোয়ালি থানায় প্রতিদিন গড়ে ৮-১০টি অভিযোগ জমা পড়ে। তবে সামাজিক হয়রানি, সময়ক্ষেপণ এবং পুলিশের প্রতি অনাস্থার কারণে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ করতে চান না।
ফলে প্রকৃত অপরাধের সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
নগরীর শম্ভুগঞ্জ, ব্রিজ মোড়, কেওটখালী, বাকৃবি শেষ মোড়, সানকিপাড়া, মীরবাড়ি, কলেজ রোড, গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড, কৃষ্টপুর, পুরোহীতপাড়া, বাঘমারা, চরপাড়া, মাসকান্দা ও জয়নুল আবেদীন পার্ক এলাকাকে ছিনতাইয়ের ‘হটস্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগে নির্জন এলাকায় ছিনতাই বেশি হলেও এখন চলন্ত অটোরিকশা ও জনসমাগমপূর্ণ স্থানেও সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাই হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বছর আটক ৪৬৭ জনের মধ্যে ৩৬২ জনই স্টেশন রোড, পুরোহীতপাড়া, সানকিপাড়া ও মীরবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। আটক হওয়া অন্তত ৩০০ জন পেশাদার ছিনতাইকারী জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে।
আইনজীবীরা বলছেন, দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৩৭৯, ৩৮৫, ৩৮৬ ও ৩৯২ ধারায় ছিনতাইয়ের মামলা হলেও সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, দীর্ঘসূত্রিতা ও তদন্তের দুর্বলতার কারণে অনেক আসামি খালাস পেয়ে যায় বা সহজে জামিন পেয়ে যায়। এতে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তির ভয় কমে যাচ্ছে এবং অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
নগরবাসীর দাবি, অপরাধপ্রবণ এলাকায় সিভিল পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে সিসিটিভি স্থাপন, মোবাইল আইএমইআই ট্র্যাকিং জোরদার, বিট পুলিশিং কার্যকরকরণ এবং দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি ছিনতাই করা পণ্য কেনাবেচায় জড়িত অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান নগরীতে ছিনতাই বৃদ্ধির সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আমরা মানুষকে সবসময় সতর্কভাবে চলাচলের পরামর্শ দিচ্ছি। কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হলে অবশ্যই থানায় অভিযোগ করবেন। পুলিশ সবসময় সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
এক বছরে ১১১ খুন ও অসংখ্য ছিনতাইয়ের ঘটনায় ময়মনসিংহ এখন অনেকের কাছেই ‘আতঙ্কের জনপদ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তার অব্যাহত থাকলেও কার্যকর বিচার ও স্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়া পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। নগরবাসীর একটাই প্রশ্ন, কবে ফিরবে নিরাপদ ময়মনসিংহ?